
পরিচিতি
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার উত্তর মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো দারুল কুরআন মাদরাসা, উত্তর মির্জাপুর। প্রতিষ্ঠানটি মূলত কুরআন হিফজ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি একাধিক বিভাগে বিস্তৃত একটি সমন্বিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এর পাশাপাশি মাদরাসার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে ইকরা একাডেমি, যেখানে সাধারণ (জেনারেল) শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।
মাদরাসা ও একাডেমি — উভয় প্রতিষ্ঠানই একই ব্যবস্থাপনা কমিটির অধীনে, একই ক্যাম্পাসে, একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে চলেছে। লক্ষ্য একটাই — শিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা দ্বীনদার, চরিত্রবান এবং একই সাথে আধুনিক জ্ঞানে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও নামকরণের ইতিহাস
প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে পরিচিত ছিল উত্তর মির্জাপুর তাহফিজুল কুরআন মাদরাসা নামে, যেখানে মূলত কুরআন হিফজ শিক্ষা দেওয়া হতো। সময়ের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং একাধিক নতুন বিভাগ চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি মাদরাসার একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ইকরা একাডেমীর প্রথম ক্লাস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। উদ্বোধনী ক্লাসে নবভর্তি শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকমণ্ডলী ও মাদরাসার শুভাকাঙ্ক্ষীগণ উপস্থিত ছিলেন। অভিভাবক
গণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এর ঠিক ১১ দিন পর, ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দেশবরেণ্য কিছু আলেমের পরামর্শক্রমে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়। এর কারণ ব্যাখ্যা করে কর্তৃপক্ষ জানায় যে, আরবি “তাহফিজুল কুরআন” শব্দের অর্থ কুরআন হিফজ করা বোঝায়; কিন্তু যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি শুধু হিফজ বিভাগে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একাধিক শাখায় পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে, তাই অপরিচিত কেউ প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে যেন মনে না করেন যে এখানে কেবল হিফজ ছাড়া অন্য কোনো উচ্চতর পড়াশোনার ব্যবস্থা নেই — সে বিবেচনা থেকেই আলেমগণ নাম সংশোধনের পরামর্শ দেন।
এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় দারুল কুরআন মাদরাসা, উত্তর মির্জাপুর। তবে হিফজ বিভাগটি পূর্বের ঐতিহ্য বজায় রেখে এখনও তাহফিজুল কুরআন নামেই পরিচালিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে দেশবরেণ্য জ্যেষ্ঠ উলামায়ে কেরাম প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন এবং এর কার্যক্রম দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে মাদরাসায় কিতাব বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এবং পাশাপাশি একটি বালিকা শাখা প্রতিষ্ঠারও ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে।
ইকরা একাডেমি: কী ও কেন?
ইকরা একাডেমি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানের দর্শন তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ভাষায়, শিশুরা আমানত — তাদের সঠিক শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রাপ্তবয়স্ক ও সমাজের দায়িত্ব। এক সময় এদেশের মুসলিম শিশুদের শিক্ষাজীবনের সূচনা হতো ইসলামি শিক্ষার মাধ্যমে, যার ফলে পরিবার ও সমাজে ইসলামি ভাবধারা গড়ে উঠত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে বলে ইকরা একাডেমি কর্তৃপক্ষ মনে করে — আধুনিকতার প্রভাবে সমাজ থেকে ধর্মীয় চেতনা, ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতা হারিয়ে যাচ্ছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ইকরা একাডেমি একটি সমন্বিত শিক্ষাকার্যক্রম গড়ে তুলেছে, যেখানে ৬০% সাধারণ (জেনারেল) শিক্ষা এবং ৪০% ইসলামি শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একই সাথে সুশিক্ষিত ও দ্বীনদার মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে বলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য — বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশীলনও চলবে, এবং জাগতিক জ্ঞানের পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহ ও প্রয়োজনীয় আরবি ভাষার জ্ঞানও অর্জন করবে শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, জাতীয় শিক্ষাক্রমের আলোকে ইসলামি ভাবধারা সংযুক্ত করে একটি বহুমুখী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে ইকরা একাডেমি থেকে পড়াশোনা শেষে কোনো শিক্ষার্থী চাইলে পরবর্তীতে হিফজ মাদরাসা, কওমি মাদরাসা, আলিয়া মাদরাসা কিংবা সরকারি-বেসরকারি সাধারণ স্কুল — যেকোনো ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে সংযুক্ত হতে পারে।
মাদরাসার বিভাগসমূহ
- তাহফিজুল কুরআন (হিফজ বিভাগ) — কুরআনুল কারীম মুখস্থকরণ শিক্ষা; মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন মূল বিভাগ, যা পূর্বের নাম অনুসারে এখনও এই নামেই পরিচালিত।
- নূরানী বিভাগ — আরবি বর্ণ পরিচিতি ও প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনের বিভাগ।
- নাজেরা বিভাগ — শুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষার বিভাগ।
- কিতাব বিভাগ — অচিরেই চালুর পরিকল্পনাধীন, যেখানে উচ্চতর ইসলামি কিতাবাদি পাঠদান করা হবে বলে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা।
- বালিকা শাখা — ভবিষ্যতে চালুর পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ঘোষিত।
এই বিভাগগুলোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অঙ্গসংগঠন ইকরা একাডেমি সাধারণ শিক্ষার ধারা পরিচালনা করছে, যা নিচে বিস্তারিত আলোচিত হলো।
ইকরা একাডেমির কারিকুলাম ও পাঠক্রম কাঠামো
ইকরা একাডেমির শিক্ষাক্রম মূলত দুটি ধারার সমন্বয়ে গঠিত —
- ৬০% সাধারণ (জেনারেল) শিক্ষা — জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে পরিচালিত মূলধারার একাডেমিক পাঠ।
- ৪০% ইসলামি শিক্ষা — কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বিত পাঠ।
প্রতিষ্ঠানের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ইকরা একাডেমিতে প্লে-গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি (Play Group – Class 2) পর্যন্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এই শ্রেণিগুলোতে ভর্তি কার্যক্রম চালু করা হয় এবং পাঠদান শুরু হয় ১লা নভেম্বর থেকে।
ইকরা একাডেমির নিজস্ব প্রচারণা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো —
- সনদপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকমণ্ডলী (Certificated Teachers)।
- কুরআনভিত্তিক শিক্ষা (Quranic Education) — পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কুরআন শিক্ষা।
- অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষণ পদ্ধতি (Motivational Teaching)।
- আখিরাতমুখী শিক্ষাদর্শন — জান্নাতের জন্য শিক্ষা (Learning for Jannah), অর্থাৎ শুধু পার্থিব সাফল্য নয়, পরকালীন কল্যাণকেও শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অনাবাসিক (Non-residential) পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ডে-কেয়ার (Day-care) সুবিধাও রাখা হয়েছে, যা কর্মজীবী অভিভাবকদের জন্য বিশেষ সহায়ক।
শিক্ষা সমাপনান্তে ভবিষ্যৎ পথ
ইকরা একাডেমির শিক্ষাক্রম এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে এখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে যেকোনো ধারার প্রতিষ্ঠানে সহজে সংযুক্ত হতে পারে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, একাডেমি থেকে শিক্ষা সমাপনকারী শিক্ষার্থীরা চাইলে হিফজ মাদরাসা, কওমি মাদরাসা, আলিয়া মাদরাসা কিংবা সরকারি-বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — এই চার ধারার যেকোনোটিতেই যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে ভর্তি হতে পারবে।
ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র
দারুল কুরআন মাদরাসা, উত্তর মির্জাপুর একটি পরিচালনা কমিটির অধীনে পরিচালিত হয়, যারা সময় সময় সাধারণ সভার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে — যার প্রমাণ ২০২৩ সালে মাদরাসার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত। প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলে জানা যায়।
উপসংহার
দারুল কুরআন মাদরাসা, উত্তর মির্জাপুর এবং এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইকরা একাডেমি — এই দুইয়ের সমন্বয়ে ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় গড়ে উঠেছে একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষা মডেল, যেখানে দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। হিফজ, নূরানী, নাজেরা বিভাগের পাশাপাশি প্লে-গ্রুপ থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার ধারা চালু রেখে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যারা একইসাথে দ্বীনদার ও যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।